Impact Lens Podcast-এর প্রথম পর্ব শুরু করতে গিয়ে আমাদের একটি ইচ্ছা ছিল—প্রতিবন্ধিতা নিয়ে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে এমন একজন মানুষের গল্প শোনা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে এই আন্দোলনের ভেতর থেকে পরিবর্তনের সাক্ষী এবং অংশীদার। সেই কারণেই আমাদের প্রথম অতিথি ছিলেন প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী, নীতি-পরামর্শক এবং উন্নয়ন পেশাজীবী ড. নাফিসুর রহমান।
নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি কোনো পদবি বা অর্জনের কথা আগে বলেন না। বরং একটি পরিচয়েই তিনি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন—প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বন্ধু ও সহযাত্রী।
“আমি অনেক বেশি খুশি হয়েছি যখন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বন্ধু ও সহযাত্রী’ হিসেবে। আসলে আমি নিজেকেও সেভাবেই দেখি।”
এই পরিচয়ের পেছনে রয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা, অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পথচলা এবং প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে নিজের ধারণাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে আবিষ্কার করার এক দীর্ঘ যাত্রা।
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল না
ড. নাফিসুর রহমানের গল্পের শুরুটা একটু অপ্রত্যাশিত।
ছোটবেলা থেকে তাঁর স্বপ্ন ছিল স্থপতি হওয়ার। কিন্তু পরিবারের ইচ্ছায় তিনি ভর্তি হন মেডিকেল কলেজে। পড়াশোনা শেষ করে চিকিৎসক হিসেবেও কাজ শুরু করেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, জীবন যেন ঠিক পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি অন্যরকম এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন।
মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মেডিসিন ক্লাবের Patients Welfare Project-এ কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন, একজন মানুষের জীবনে চিকিৎসার বাইরেও অসংখ্য বাস্তবতা কাজ করে।
চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পরও সেই প্রশ্নগুলো তাঁকে ছাড়েনি।
তিনি ভাবছিলেন—কোন বিষয়ে বিশেষায়িত হবেন? ভবিষ্যৎ কোন দিকে নিয়ে যাবেন?
ঠিক সেই সময় একটি সংবাদপত্রে তাঁর চোখে পড়ে একটি বিজ্ঞাপন।
একটি ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এমন একজন চিকিৎসক খুঁজছে, যিনি ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরির কাজ করবেন।
তিনি আবেদন করলেন।
আর অবাক করার মতো বিষয় হলো—১৩৫ জন প্রার্থীর মধ্যে নির্বাচিতও হয়ে গেলেন।
তিন মাস, যা বদলে দিল একটি জীবন
নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁকে জানানো হয়, প্রথম তিন মাস থাকবে probation period।
তখনও তিনি জানতেন না, এই সময়ের অর্থ কী।
এক আত্মীয়ের কাছে জানতে পারেন, তিন মাস পরে প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নেবে তাঁকে রাখবে কি না।
এই কথাটি তাঁর মনে আরেকটি প্রশ্ন জাগায়।
“ওরা যদি তিন মাস পরে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, আমিও তো নিতে পারি—আমি এই পেশায় থাকব কি না।”
এই তিন মাসেই তিনি এমন কিছু করলেন, যা পরবর্তী জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।
তিনি বই পড়তে শুরু করলেন।
প্রতিবন্ধিতা নিয়ে।
প্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে শুরু করলেন।
তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনলেন।
আর তখনই তাঁর সবচেয়ে বড় উপলব্ধি।
“আমরা চিকিৎসকরা মনে করি প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে অনেক কিছু জানি। আসলে আমরা খুব অল্পই জানি। চিকিৎসাগত পুনর্বাসনের কথা জানি, কিন্তু সামাজিক পুনর্বাসন, অর্থনৈতিক পুনর্বাসন, অধিকার—এসব বিষয়ে আমাদের পাঠ্যক্রমে কিছুই ছিল না।”
এই উপলব্ধিই তাঁকে নতুন এক পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
তিনি বুঝতে শুরু করেন, একজন মানুষের শরীরের সীমাবদ্ধতার চেয়েও বড় বাস্তবতা হলো সমাজের তৈরি করা সীমাবদ্ধতা।
‘ছয় মাসও থাকবে না’
ড. নাফিসুর রহমান একটি মজার স্মৃতিও শোনান।
তিনি যখন প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেন, তখন এই ক্ষেত্রের অনেক প্রবীণ কর্মী নাকি নিজেদের মধ্যে বাজি ধরেছিলেন।
একজন ডাক্তার এই সেক্টরে কতদিন টিকবেন?
কারও ধারণা ছিল ছয় মাস।
কারও ধারণা ছিল তারও কম।
কারণ সবাই ভেবেছিলেন, তিনি আবার চিকিৎসা পেশায় ফিরে যাবেন।
আজ সেই ঘটনার বত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
হাসতে হাসতেই তিনি বলেন,
“বাজিটা আসলে কী নিয়ে ছিল জানি না। তবে যাঁরা ছয় মাস বলেছিলেন, তাঁদের ধারণা আর ঠিক হয়নি। আমি আর ফিরে যাইনি।”
একটি ম্যানুয়াল, একটি আন্দোলনের শুরু
তাঁর প্রথম দায়িত্ব ছিল প্রতিবন্ধিতা নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরি করা।
কাজটি শুরু করতে গিয়ে তিনি আরেকটি বিস্ময়কর তথ্য জানতে পারেন।
তখন শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়েও এই বিষয়ে পরিচিত প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল ছিল হাতে গোনা কয়েকটি।
প্রচলিত পদ্ধতিতে বই লেখার বদলে তাঁরা ভিন্ন পথ বেছে নেন।
মানুষ প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কী কী প্রশ্ন করতে পারে—সেই সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় ম্যানুয়ালটি।
পরবর্তীতে এই কাজই বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান Centre for Disability in Development (CDD)-এর প্রাথমিক জ্ঞানভান্ডারের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
প্রকল্প নয়, পরিবর্তন
ActionAid-এ কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, ছোট ছোট প্রকল্প অনেক মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে।
কিন্তু প্রকল্পেরও একটি সীমা আছে।
অর্থায়ন শেষ হলে অনেক উদ্যোগও থেমে যায়।
এই সময়েই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছিল।
Charity-based approach ধীরে ধীরে জায়গা করে দিচ্ছিল Rights-based approach-কে।
ড. নাফিসুর রহমানও বুঝতে শুরু করেন, শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়—নীতিনির্ধারণে কাজ করাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।
সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি যোগ দেন জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামে।
সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর নীতি-প্রভাব, আইন, অধিকার এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্বের নতুন অধ্যায়।
একটি সিদ্ধান্ত, যা পরে পরিবারও বুঝেছিল
চিকিৎসা পেশা ছেড়ে উন্নয়ন খাতে চলে আসার সিদ্ধান্তটি পরিবার সহজভাবে নেয়নি।
বিশেষ করে তাঁর বাবা।
অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন।
একজন চিকিৎসক তৈরি করতে যে পরিশ্রম, যে প্রত্যাশা—সবকিছু যেন হঠাৎ অন্য পথে চলে গেল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃষ্টিভঙ্গিও বদলায়।
যখন তিনি জাতীয় পর্যায়ে নীতি প্রণয়ন, আইন, অধিকার এবং অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন তাঁর বাবা উপলব্ধি করেন—একজন চিকিৎসক হয়তো প্রতিদিন কয়েকজন মানুষের জীবন বদলাতে পারেন, কিন্তু নীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে লক্ষ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলা সম্ভব।
“আমি বুঝি না—আমি শিখছি”
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করলেও ড. নাফিসুর রহমান একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন।
“আমরা সহমর্মী হতে পারি। সহযাত্রী হতে পারি। কিন্তু একজন প্রতিবন্ধী মানুষ যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়, সেটা পুরোপুরি কখনও অনুভব করতে পারব না।”
এই স্বীকারোক্তিই সম্ভবত তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তিনি নিজেকে কখনও বিশেষজ্ঞ হিসেবে নয়, বরং একজন শিখতে থাকা মানুষ হিসেবে দেখেন।
আর সেখান থেকেই শুরু হয় সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তির যাত্রা।
পরবর্তী পর্বে: প্রতিবন্ধিতা: চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়, নাকি সমাজের? — ড. নাফিসুর রহমান ব্যাখ্যা করবেন কীভাবে ‘চ্যারিটি’ থেকে ‘অধিকার’-এর ধারণায় পৌঁছেছে বিশ্ব, এবং কেন আজও প্রতিবন্ধিতা নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা তথ্যের অভাব নয়, বরং ভুল বোঝাবুঝি।





